এম.ইব্রাহিম খলিল মামুন ॥
কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূমি অধিগ্রহণে অনিয়মের সঙ্গে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: রুহুল আমিন, তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: জাফর আলম, জরিপকারী ও কানুনগোর সম্পৃক্ততা মিলেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. আলেফ উদ্দিনের নেতৃত্বে এ তদন্তকাজ সম্পন্ন হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে ‘পরস্পর যোগসাজশে’ দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যাতে আর এ ধরনের অনিয়ম না হয়, সেজন্য শক্ত নির্দেশনাসহ জমির প্রকৃত মালিককে অধিগ্রহণের টাকা হস্তান্তরের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তদন্তের সত্যতা স্বীকার করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্ বলেন, প্রকল্পটিতে পারস্পরিক যোগসাজশে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির প্রকৃত মালিকদের যাবতীয় ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে এ মূল্য পরিশোধ করা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সরকারি জরিপকারী ও কানুনগোদের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মহেশখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি বিবরণ নেয়। তাতে সব জমির বিবরণের ঘরে লেখা হয় ‘চিংড়িঘের’। পুরো জমি দেখানো হয় চিংড়িঘের ও ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে। এমনকি খাসজমি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি, উঁচু পাহাড়ি শ্রেণীর জমিকেও চিংড়িঘের হিসেবে দেখানো হয়। আর জমির প্রকৃত মালিকদের বাদ দিয়ে ভুয়া মালিকদেরও একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এদের অনেককেই আবার দেখানো হয় চিংড়িঘেরের ইজারাদার হিসেবে।
জমির প্রকৃত মালিকদের বাদ দিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে জমির একটি বিবরণ তৈরি করে তার ভিত্তিতে ভুয়া মালিকদের অর্থ প্রদান করা হয়। প্রথম দফায় পরিশোধ করা হয় ২৩ কোটি টাকা। এ ঘটনায় কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), জরিপকারী ও কানুনগোকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হলেও জেলা প্রশাসক এখনো স্বপদে বহাল।
এদিকে কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত থেকে ২০ জানুয়ারির মধ্যে দুর্নীতি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুদক চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক আবদুল আজিজ ভুঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের শুরুতেই জমি অধিগ্রহণের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ দেয়াকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন ও জমি মালিকদের পক্ষ থেকে আলাদা মামলা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির প্রকৃত মালিকদের আড়াল করে প্রশাসনসহ একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চিংড়িঘের ও স্থাপনার জমি অধিগ্রহণ বাবদ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। জমি অধিগ্রহণে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও কোল পাওয়ার জেনারেশন কোং বাংলাদেশ লিমিডেটের প্রকল্প পরিচালকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে গত বছরের নভেম্বরে মামলা করেন মাতারবাড়ীর বাসিন্দা একেএম কায়সারুল ইসলাম। কক্সবাজার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটি করা হয়।
বাদী আবেদনে অভিযোগ করেন, মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়ার নামে হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্পটির জন্য ১ হাজার ৪১৪ একর জমি হুকুম দখল করা হয়। প্রকল্পে ক্ষতিপূরণের টাকা মূল্যায়ন করতে গিয়েই জালিয়াতি শুরু হয়। দ্বীপের চিংড়ি প্রকল্পের মালিকদের নানাভাবে প্রলোভন দিয়ে ভুয়া কাগজ সৃজনের মাধ্যমে মৎস্য কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘অবাস্তব রিপোর্ট’ তৈরি করে হাতিয়ে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা। চিংড়ি প্রকল্পের প্রতি কেজি চিংড়ির মূল্য ৮০০ টাকা হিসাবে প্রতিটি চিংড়ি প্রকল্পে চিংড়ির মজুদ দেখানো হয় অস্বাভাবিক হারে। আর মৎস্য বিভাগ থেকে এ রকম অবাস্তব প্রতিবেদনের ফলে একটি চিংড়ি প্রকল্পে যেখানে ১ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ হওয়ার কথা, সেখানে তা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। জালিয়াত চক্রটি নিজেদের কোনো জমি ও চিংড়ি প্রকল্প না থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমেই এ বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি হুকুম দখল অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২১ জন ভুয়া চিংড়িচাষীর বিরুদ্ধে ২৩টি সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে। পরে একটি সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করা হয়। মামলায় ভুয়া চাষী বানিয়ে ২২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর এ মামলাগুলো রেকর্ড করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে দেশের সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পে নির্মিত হচ্ছে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুকন্দ্র। সঙ্গে থাকছে কয়লা খালাসের বন্দর ও অবকাঠামো। কয়লাভিত্তিক মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের  ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৬৬ লাখ, জাইকার অর্থায়ন ২৮ হাজার ৯৩৯ কোটি ৩ লাখ ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ১১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।এ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৪০০ একর ভূমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে ৩০০ একর খাসজমি ও ২০০ একর পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন জমি। অবশিষ্ট ৯০০ একরের মতো জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। প্রকল্পটিতে ক্ষতিপূরণের টাকা বাবদ ২৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এসব জমির কিছু আছে ফসলি, কিছু টিলা ও কিছু জমি চিংড়িঘের।