ভুমি আইন সম্পর্কে জানে না
# শফিক আজাদ, উখিয়া॥
কক্সবাজারের উখিয়ার হাজার হাজার জমির দাতা ও গৃহীতারা বাংলাদেশের ভুমি আইনে কি আছে তা সম্পর্কে তারা জানেন না। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি দালাল চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে।
ফলে দিনের পর দিন সাবরেজিষ্টার কার্যালয়ে আগত জমির দাতার গ্রহীতারা বিভিন্ন ভাবে প্রতারিত হচ্ছে। উখিয়া সদরের ১০/১২ জনের একটি দলিল লিখক ও নকল কারক সিন্ডিকেট, দালাল-ফড়িয়া ও সাবরেজিষ্টার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনৈতিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অত্যচারে বিষিয়ে তুলেছে দাতা গ্রহীতাদের। সাবরেজিষ্ট্রার অফিসের রেজিষ্ট্রি সম্পর্কিত তথ্য তাদের জানা না থাকায় পদে পদে অতিরিক্ত ফিসের দাবানলে পড়ে অনেকেই সর্বশান্ত হচ্ছে। এ উপজেলার হাজিরপাড়ার আব্দুল হাকিম জানান, অতিরিক্ত ফিসের ব্যাপারে প্রতিবাদ করায় তার একমাত্র ভিটে মাটির দলিলটি এখনো রেজিষ্ট্রি সম্পাদন হয়নি। একই ভাবে পালংখালী ইউনিয়নের মোঃ জলিলের তার ভিটের জমিটি অন্যের নামে ছিল। ওই জমিটি না দাবীতে কিংবা ফেরত দেওয়ার রেজিষ্ট্রি দিতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কারণে রেজিষ্ট্রি করাতে পারেনি।
এদিকে উখিয়া সদরে গড়ে উঠা দালাল চক্র ও দলিল লিখক ও নকল কারক সিন্ডিকেট ও সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মচারীরা নিজের খেয়াল-খুশি মত যা ইচ্ছা তাই করছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে জানান, রাতা-রাতি অনেক দলিল লিখক ও সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে অর্থ ও সম্পদের মালিক বনে গেছেন। যেমন অফিস সহকারী চিত্তরঞ্জন সুশীল, মোহরার সজীব কান্তি দে, এমএ ছিদ্দিক ও মোকতার আহমদ কোটিপতি বনেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, স্ট্যাম্প ডিউটি বিধি মোতাবেক দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে যে ফি আদায় করছে ঠিক তার দ্বিগুন অর্থ গুনতে হয় জমি দাতা ও গ্রহীতাদের। তুলনামূলক যদি সরকারী ফি ১ লক্ষ মূল্যমানের দলিলে যদি ১০ হাজার টাকা হয় এ ক্ষেত্রে ২০/৩০ হাজার টাকাও আদায় করা হচ্ছে। এ ভাবে কোটি টাকার দলিলে কত অবৈধ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তার কোন সঠিক ইয়াত্তা নেই। বিশেষ করে দলিল লিখকদের নিকট নিমর্মভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন দাতা ও গ্রহীতারা।
উপজেলার ১২টি মৌজার মধ্যে বর্তমানে ৬টি মৌজায় সরকারী নিষেধাজ্ঞা থাকায় এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে অনুমতি পেলে তার পর তা বিক্রি করা যায়। যে সব মৌজায় সরকারী নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সে গুলো হচ্ছে জালিয়াপালং, ইনানী মৌজা, রতœাপালং মৌজা, রুমখাঁ পালং মৌজা, উখিয়ার ঘাট ও পালংখালী মৌজার জমি বেঁচা কেনা বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য মৌজার জমি ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে দামের পার্থক্য হয়। উপজেলা সদর ছাড়া প্রতিটি মৌজার জমি বিঘা প্রতি ৪ লাখ টাকা বিক্রয় হয়। অথচ সদরের প্রতি শতাংশ জমির মূল্য সর্বনিন্ম ১ লাখ ৫০ হাজার কিংবা ২ লাখ টাকা। আর এ সুযোগকে হাত ছাড়া করতে নারাজ কতিপয় দলিল লিখক ও নকল কারক এবং সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা- কর্মচারীরা। তাদের ইচ্ছামত অতিরিক্ত অর্থ জমি দাতা গ্রাহীতাদের নিকট থেকে আদায় করে থাকেন। উখিয়া সদরের দলিল লিখক ও নকল কারক সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়টিকে ঘিরে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। ওই সিন্ডিকেট ঠিক করেন কোন মৌজার জমি কোন দামে রেজিষ্ট্রি হবে।
সূত্র জানা যায়, ১ লাখ টাকার উপরে এক রকম দাম, নিচে আর এক দাম। ৫ লাখ টাকার উপরে আরেক দাম। ১০ লাখ টাকার উপরে আর এক দাম। এভাবে জমিদাতা ও গ্রহীতারা ভুমি আইন সম্পর্কে জ্ঞাত না হওয়ার কারণে দলিল লিখকদের নিকট প্রতারণার শিকার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারী বিধি-বিধানে কোন বালাই নেই।
একজন জমি দাতা ও গ্রহীতা ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এক বিঘা জমি রেজিষ্ট্রি করতে কত টাকার স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি, ট্রাজারী চালান, অফিস খরচ, দলিল লিখকের খরচসহ অন্যান্য খরচ কত টাকা তা ক্রেতা বিক্রেতারা জানেন না। এ ছাড়া এক বিঘা জমির দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে খাজনা খারিজ ফি কত তা কেউ জানেন না। অপর দিকে দলিল দাতারা জীবন জীবিকার প্রয়োজনে দলিল লিখকের নিকট জিম্মি হয়ে পড়েছে। কোন ব্যক্তি অত্যান্ত কঠোর প্রয়োজন ও ঠেকায় পড়ে নিরোপায় হয়ে নিজের শেষ সম্বল হিসেবে বাড়ি ঘর, ভিটা, পুকুর, টিলা, নাল জমি, বাঁশ ঝাড়, জলাশয়, পাহাড়ী, ধানীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর জমি ক্রয় করতে সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়ে এসে প্রথমে যান তার নিকটতম অথবা পরিচিত দলিল লিখক ও নকল কারকের কাছে। একজন দলিল দাতার শুরু হয় অর্থনৈতিক ভাবে খরচের পালা। নানা অজুহাতে দলিল লিখককেরা প্রথম দফায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। তারপর দ্বিতীয় দফা সাবরেজিষ্ট্রার কার্যালয়ে দেওয়ার অজুহাতে আর এক দফা হাতিয়ে নেন। আসলে তার দলিল থেকে সরকার কত টাকা রাজস্ব ফেল এ কোন হিসাব বা চিন্তা ক্ষতিগ্রস্থ দলিল দাতারা করেন না। তবে সব কথার শেষ কথা হচ্ছে এসব অবৈধ লেনদেনের সিংহভাগ টাকা চলে উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রারের কাছে। এব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রার নজরুল ইসলাম এসব কথা অস্বীকার করে বলেন, জমি দাতা-গ্রহীতা তাদের সুবিধা মতো লোকজন দেখে দলিল সম্পাদন করে থাকেন। সেখানে আমার কোন হাত নেই।

0 Comments